একটা মজার হাসির গল্প “আয়না”।

গপ্লের নাম “আয়না”

এক চাষি ক্ষেতে ধান কাটিতে-কাটিতে একখানা আয়না কুড়াইয়া পাইল । তখন এদেশে আয়নার চলন হয় নাই। কাহারও বাড়িতে একখানা আয়না কেহ দেখে নাই। এক কাবুলিওয়ালার ঝুলি হইতে কী করিয়া আয়নাখনা মাঠের মাঝে পড়িয়া গিয়াছিল। আয়নাখানা পাইয়া চাষি হাতে লইল। হঠাৎ তাহার উপরে নজর। দিতেই দেখে, আয়নার ভিতর মানুষ! আহা-হা, এযে তাহার বাপজানের চেহারা! বহুদিন তার বাপ মারা গিয়াছে। আজ বড় হইয়া চাষির নিজের চেহারাই তার বাপের মতো হইয়াছে। সব ছেলেই বড় হইয়া কতকটা বাপের মতো চেহারা পায়। তাই আয়নায় তাহার নিজের চেহারা দেখিয়াই চাষি ভাবিল, সে তাহার বাবাকে দেখিতেছে। তখন আয়নাখানাকে কপালে তুলিয়া সে সালাম করিল। মুখে লইয়া চুমো দিল। “আহা বাপজান! তুমি আসমান হইতে নামিয়া আসিয়া আমার ধানক্ষেতের মধ্যে লুকাইয়া আছ! বাজান-বাজান! ও বাজান!”  চাষি এভাবে কথা কয় আর আয়নার দিকে চায়। আয়নার ভিতরে তাহার বাপজান কতই ভঙ্গি করিয়া চায় । চাষি বলে, “বাজান! তুমি তো মরিয়া গেলে। তোমার ক্ষেত ভরিয়া আমি সোনাদিঘা ধান বুনিয়াছি,শাইল ধান বুনিয়াছি । দেখ-দেখ বাজান! কেমন তারা রোদে ঝলমল করিতেছে। তোমার মরার পর বাড়িতে মাত্র এক ঘর ছিল। আমি তিনখানা ঘর তৈরি করিয়াছি। বাজান! আমার সো­­­­­­­নার বাজান! আমার মানিক বাজান। সে দিন চাষি  আর কোনো কাজই করিল না। আয়নাখানা হাতে লইয়া তার সবগুলি ক্ষেতে ঘুরিয়া বেড়াইল। সাঁঝ হইলে বাড়ি আসিয়া আয়নাখানাকে কোথায় রাখে। সে গরিব মানুষ। তাহার বাড়িতে তো কোনো বাক্স নাই! সে পানির কলসির ভিতর আয়নাখানাকে লুকাইয়া রাখিল। পরদিন চাষি এ কাজ করে, ও কাজ করে, দৌড়াইয়া বাড়ি আসে। এখানে যায়, সেখানে যায়, আর দৌড়াইয়া বাড়ি আসে। পানির কলসির ভিতর হইতে সেই আয়নাখানা বাহির করিয়া নাড়িয়া চাড়িয়া দেখে, আর কত রকমের কথা বলে! “বাজান! আমার বাজান! তোমাকে একলা রাখিয়া আমি এ-কাজে যাই ও-কাজে যাই তুমি রাগ করিও না। দেখ বাজান! যদি আমি ভালোমতো কাজকাম না করি তবে আমরা খাইব কী?” চাষির বউ ভাবে, “দেখরে। এতদিন আমার সোয়ামি আমার সাথে কত কথা বলিত, কত-হাসি-তামাশা করিয়া এটা-ওটা চাহিত, কিন্তু আজ কয়দিন আমার সাথে একটাও কথা বলে না। পানির কলসি হইতে কী যেন বাহির করিয়া দেখে, আর আবোল-তাবোল বকে, ইহার কারণ কী?” সেদিন চাষি ক্ষেত-খামারের কাজে মাঠে গিয়াছে। চাষির বউ গোপনে-গোপনে পানির কলসি হইতে সেই আয়নাখানা বাহির করিয়া তাহার দিকে চাহিয়া রাগে আগুন হইয়া উঠিল। আয়নার উপর তার নিজেরই ছায়া পড়িয়াছিল; কিন্তু সে তো কোনোদিন আয়নায় নিজের চেহারা দেখে নাই। সে মনে করিল, তার সোয়ামি আর একটি মেয়েকে বিবাহ করিয়া আনিয়া এই পানির কলসির ভিতর লুকাইয়া রাখিয়াছে। সেইজন্য আজ কয়দিন তার স্বামী তার সাথে কোনো কথা বলিতেছে না। যখনই অবসর পায় ওই মেয়েছেলের সাথে কথা বলে। “আসুক আগে মিনসে বাড়ি। আজ দেখাইব এর মজা!” একটি ঝাঁটা হাতে লইয়া বউ রাগে ফুলিতে লাগিল; আর যে-যে কড়া কথা সোয়ামিকে শুনাইবে, মনে-মনে আওড়াইয়া তাহাতে শান দিতে লাগিল। দুপুরবেলা মাঠের কাজে হয়রান হইয়া, রোদে ঘামিয়া, চাষি যখন ঘরে ফিরিল, চাষির বউ ঝাটা হাতে লইয়া  তাড়িয়া আসিল; “ওরে গোলাম, তোর এই কাজ? একটা কাকে বিবাহ করিয়া আনিয়াছিস?” এই বলিয়া আয়নাখানা চাষির সামনে ছুড়িয়া মারিল। “কর কী? ও যে আমার বাজান!” অতি আদরের সাথে সে আয়নাখানা কুড়াইয়া লইল। দেখাই আগে তোর বাজান!” এই বলিয়া ঝটকা দিয়া আয়নাখানা টানিয়া লইয়া বলিল, “দেখ তো মিনসে! এর ভিতর কোন মেয়েলোক বসিয়া আছে? এ তোর নতুন বউ কিনা?”নচাষি বলে, “তুমি কি পাগল হইলে? এ যে আমার বাজান!” “ওরে গোলাম! ওরে নফর! তবু বলিস তোর বাজান! তোর বাজানের কি গলায় হাসলি নাকে নথ আর ? কপালে টিপ আছে নাকি?” বউ আরও জোরে চিৎকার করিয়া উঠিল। ও বাড়ির বড়বউ বেড়াইতে আসিয়াছিল। মাথায় আধ-ঘােমটা দিয়া বলিল, “কিলো, তোদের বাড়ি এত  ঝগড়া কিসের? তোদের ত কত মিল। একদিনও কোন কথা কাটাক্কটি শুনি নাই।” চাষির বউ আগাইয়া আসিয়া বলিল-“দেখ বুবুজান! আমাদের মিনসে আর একটি লউ বিবাহ কলিয়া জানিয়া পানির কলসির ভিতর লুকাইয়া রাখিয়াছিল। ওই সতিনের মেয়ে সতিনকে আমি পা দিয়া গিন্ধিয়া জেলিৰ না? দেখ-দেখ, বুবুজান! এই আয়নার ভিতর কে?” ও বাড়ির বড়বউ আসিয়া সেই আয়নার উপরে মুখ দিল! তখন দেখা গেল আয়নার ভিতরে দুইজনের মুখ । ও বাড়ির বড়বউ বলিল, “এ তো তোমার চেহারা। আর একজন কার চেহারাও যেন দেখিতে পাইতেছি।” চাষি বলিল, “কী বলেন বুবুজান, এর ভিতর আমার বাপজানের চেহারা।” এই বলিয়া চাষি আসিয়া আয়নার উপরে মুখ দিল। তখন তিনজনের চেহারাই দেখা গেল। তাহাদের কলরব শুনিয়া ও বাড়ির ছোট-বউ, সে বাড়ির মেজোবউ আসিল, আরফানের মা, রহমানের বোন, আনোয়ারার নানী আসিল। যে আয়নার উপরে মুখ দেয়, তাহারি চেহারা আয়নায় দেখা যায়—এ তো বড় তেলেহুমতির কথা! শোন, শোন, এই কথা এ-গাঁয়ে সে-গাঁয়ে রটিয়া গেল। এ-দেশ হইতে ও দেশ হইতে লোক ছুটিয়া আসিল সেই জাদুর তেলেছমাতি দেখিতে। তারপর ধীরে-ধীরে লোকে বুঝিতে পারিল, সেটা আয়না।

 লেখকঃ জসীমউদ্দীন ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দের ১লা জানুয়ারি ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রামবাংলার প্রকৃতি ও সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে তিনি কবিতা লিখেছেন। তাঁর কবিতায় পল্লিজীবন বেশি উঠে এসেছে বলে তাকে বলা হয় পল্লিকবি। তিনি অনেক গদ্যও রচনা করেছেন। তিনি স্মৃতিকথা, ভ্রমণকাহিনী, নাটক ও প্রবন্ধ লিখেছেন। শিশুদের জন্য লেখা ডালিমকুমার’ তাঁর অনবদ্য রচনা। এ ছাড়াও তিনি ছােটদের জন্য লিখেছেন হাসু’, ‘এক পয়সার বাঁশী’ ইত্যাদি কবিতাগ্রন্থ। তিনি ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ই মার্চ ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।

One thought on “একটা মজার হাসির গল্প “আয়না”।

Comments are closed.