সুশিক্ষার নির্দেশ-সন্তানদের সুশিক্ষার নির্দেশ বা সন্তানদের অধিকার

সুশিক্ষার নির্দেশ “সন্তানদের সুশিক্ষার নির্দেশ বা সন্তানদের অধিকার ”

সুশিক্ষার নির্দেশ- প্রিয় পাঠক আমার পোষ্টটি মুলত পিতামাতার কি ধরনের দায়িত্ব আছে সন্তান প্রতিপালনে এবং সেই দায়িত্ব যদি অবহেলা করলে বিনিময়ে তাদের সেই ফল ভোগ করতে হবেে। এরকম-ই একটি বিষয় নিয়ে হাদিস তুলে ধরলাম।আজকের শিরোনাম “সন্তানদের সুশিক্ষার নির্দেশ বা সন্তানদের অধিকার ”।

হাদীস: হযরত মু’আয (রাঃ) বলেন,“ হুযূর (সাঃ) আমাকে দশটি বিষয়ে অসীয়ত করেছেন।”

(১) আল্লাহর সাথে (কোন কিছুকে) শরীক (অংশীদার সাব্যস্ত) করবে না যদিও তোমাকে (প্রাণে) হত্যা করা হয়  এবং (আগুনে) জ্বালিয়া দেওয়া হয়।

(২) মা-বাবাকে কখনও কষ্ট দিবেনা, যদিও তারা তোমাকে নিজের পরিবার-পরিজন ধন সম্পদ হতে বের হয়ে যেতে বলেন।

(৩) সাবধান ইচ্ছা করে ফরয নামায ছাড়বে না। কেননা, যেই ব্যক্তি ইচ্ছা করে ফরয নামায ছেড়ে দিল, তার উপর হতে আল্লাহ পাকের জিম্মাদারী উঠে গেল ।

(৪) সাবধান মদ্যপান করবেনা। কেননা উহা সর্ব প্রকার নির্লজ্জা কাজের মূল।

(৫) গুনাহ হতে বেঁচে থাকবে। কেননা গুনাহ আল্লাহ পাকের অসন্তুষ্টির কারণ।

(৬) যুদ্ধের ময়দান হতে পলায়ন করবে না। যদিও তোমার সকল সাথীর প্রাণ চলে যায়।

(৭) মানুষ যখন (কলেরা বসন্তের কারণে) মরতে থাকে এবং তুমি যদি সেখানে উপস্থিত থাক, তাহলে সেই জায়গা হতে চলে যাবেনা। বরং ছাবেত কদম (দৃঢ়তার সাথে) থাকবে।

(৮) পরিবার পরিজনের জন্য নিজের উত্তম সম্পদ খরচ কর।

 (৯) আদব শিক্ষা দেওয়ার জন্য নিজের লাঠি প্রস্তুত রাখবে এবং পরিবার পরিজনের দিক হতে (অমনোযোগী হয়ে লাঠি) উঠিয়ে রাখবেনা।

 (১০) এবং তাদেরকে আল্লাহ পাকের (আদেশ নিষেধের) ব্যাপারে ভয় দেখাতে থাকবে।

        (মেশকাত, পৃঃ ১৮ মছনদে আহমদ)

বিস্তারিত বর্ণনা:

“সন্তানদের সুশিক্ষার নির্দেশ বা সন্তানদের অধিকার” এই শিরোনামে যে হাদিস দেওয়া হয়েছে তার সংক্ষিপ্ত আলোচনা নিচে করা হল।

এই হাদীসটিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দশটি উপদেশ বর্ণিত হয়েছে। প্রতি উপদেশের জন্য এক একটি বইয়ের প্রয়োজন,তবে এখানে সংক্ষেপে কিছু ব্যাখ্যা উল্লেখ করছি।

প্রথম উপদেশ:- আল্লাহ পাকের সাথে কর্ম জীবনে এবং আকীদা বিশ্বাসে (তার জাত ও সিফাতের মধ্যে) কোন কিছুকে শরীক না করা।

যদিও কোন দল বা ব্যক্তি শিরক করার জন্য শক্তি প্রয়োগ করে, তথাপি অন্তরে শিরকী আকীদা স্থান দিবেনা। যদিও তোমাকে হত্যা করা হয় অথবা আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হয়।

প্রাণ রক্ষার খাতিরে মুখে শিরকী বা কুফরী কথা বলা জায়েয আছে, যদি অন্তরে ঈমান মজবুত থাকে। কিন্তু উত্তম হল জান দিয়ে দিব, তথাপি ঈমান বিরোধী কোন কথা মুখে উচ্চারণ করবে না।

দ্বিতীয় উপদেশ:- পিতা-মাতাকে কষ্ট না দেওয়া, যদিও তাঁরা বাড়ীঘর ছেড়ে চলে যেতে বলেন। ইহা দ্বারা মা-বাবার আদেশ ও নিষেধের গুরুত্ব বুঝানো হয়েছে। এর অর্থ মা-বাবা এই ধরণের নির্দেশ দিলে তা অমান্য করে তাঁদের মনে কষ্ট দিবেনা। ইসলামী শরীঅতে যদিও সর্ব ক্ষেত্রে মা-বাবাকে এই ধরণের অনুমতি দেয় না।

তৃতীয় উপদেশ:- ফরয নামায ইচ্ছা করে কখনও ছাড়বেনা। আরও বলেন- যে ব্যক্তি ইচ্ছা করে ফরজ নামায ছেড়ে দেয় তার প্রতি আল্লাহর কোন জিম্মাদারী থাকেনা।

অর্থাৎ সে দুনিয়া ও আখেরাতে আল্লাহর কোন সাহায্য পাবে না।

চতুর্থ উপদেশঃ- সাবধান কখনও মদ্যপান করবেনা, কেননা ইহা সমস্ত গুনাহের শিকড়।

মদ্যপান করার পর মানুষ জ্ঞান হারিয়ে ফেলে এবং মনে যা চায় তাই করে বসে। মদ্যপানকে একটি হাদীসে বলা হয়েছে, অর্থাৎ তাহা সকল অপকর্মের চাবি। অন্যত্রও বলা হয়েছে অর্থাৎ সুরা পান করাকে সকল খারাপ কাজ ও মন্দ কাজের মা বলা হয়েছে।

 পঞ্চম উপদেশ: – গুনাহ করবেনা, গুনাহের কারণে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হন এবং বিভিন্ন প্রকারের পেরেশানীতে নিপতিত করেন ।

ষষ্ঠ উপদেশ: – তোমার সমস্ত সাথী যদি মারাও যায় তথাপি যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পলায়ন করবে না।  কেননা যুদ্ধ ক্ষেত্রে হতে ভেগে যাওয়া কবীরা গুনাহ।

সপ্তম উপদেশঃ- যে জায়গায় মানুষ মহামারীতে (কলেরা বা বসন্তে) মরতে থাকে ঐ জায়গায় তুমি উপস্থিত থাকলে তথা হতে পলায়ন করবে না, বরং দৃঢ়তার সাথে সেখানেই অবস্থান করবে।

এক হাদীসে এসেছে- কোন এলাকায় মহামারীর (কলেরা বসন্তের) খবর পেলে, তুমি সেখানে যাইওনা, আবার তুমি যেই এলাকায় আছ সেখানে মহামারী (কলেরা বসন্ত) আরম্ভ হলে সেখান হতে পলায়নের উদ্দেশ্যে বেরও হয়োনা।(বুখারী মুসলিম)

এই উপদেশের মধ্যে অনেক নিগুঢ় তথ্য ও উপকারীতা রয়েছে। যেমন:- যারা সুস্থ আছে, তারা যদি সে এলাকা ত্যাগ করে। তবে মৃত দেহগুলি এইভাবে পড়ে থাকবে যে, কাফন দাফনের কোন ব্যবস্থা হবে না।

এই জন্য নির্দেশ করা হয়েছে যে, দৃঢ়তার সাথে সেখানে থেকে যাবে। এবং আল্লাহ জাল্লাশানুহুর লিখিত অলঙ্নীয় তকদীরের উপর সন্তষ্ট থাকবে।

হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, হুযুর (সাঃ) এরশাদ করেন, কোথাও মহামারী (কলেরা-বসন্ত) আরম্ভ হয়ে যাওয়া অবস্থায়, যদি কেউ ধৈর্য ধারণ করে সওয়াবের উদ্দেশ্যে এই একিন ও বিশ্বাস নেয় যে, আল্লাহ আমার তকদীরে যা ফয়সালা করে রেখেছেন, এর চেয়ে বেশী কিছুই কষ্ট আমার হবে না। তাহলে সে একটি শহীদের সওয়াব পাবে। (বুখারী)

মহামারিতে আক্রান্ত এলাকায় যাওয়ার নিষেধ করা হয়েছে তার এক তথ্য ইহাও যে, এমন এলাকায় গিয়ে কেউ যদি মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে পড়ে, তখন সে চিন্তা করবে, এখানে না আসলে এই মসিবতে পতিত হতাম না।

এই ধরণের চিন্তা করায় তওহীদের (একত্ববাদের) আকীদায় ত্রুটি আসবে।

৮ম উপদেশ :- নিজের পরিবার পরিজনের মধ্যে নিজের উত্তম মাল খরচ করবে।

৯ম উপদেশ:- আর তাদেরকে আদব শিক্ষা দিতে থাকবে। তাদের ব্যাপারে অমনোযোগী হবে না। লাঠি উঠিয়া রাখবেনা, অর্থাৎ তাদেরকে শাসন করতে থাকবে। ?

১০ম উপদেশঃ – পরিবার-পরিজনকে আল্লাহর আদেশ-নিষেধের ব্যাপারে ভীতি প্রদর্শন করতে করতে থাক।

৮, ৯, ১০ম এই তিনটি উপদেশে পরিবার পরিজনদের প্রতিপালন সংক্রান্ত ব্যাপার। অর্থাৎ পরিবার পরিজনদের প্রতিপালনে কৃপণতা করবে না। বরং তাদের জন্য উত্তম মাল খরচ কর। আল্লাহর রহমত ও নিয়ামত হতে তাদেরকে বঞ্চিত রাখিওনা।

যাতে তাদের দৃষ্টি অন্যের দিকে না যায়। তবে শারীরিক প্রতিপালন এবং দুনিয়াবী আরাম ও আয়েশের সাথে সাথে ধর্মীয় চিন্তা, আদব আখলাক, মানব সমাজের সাথে সুন্দর জীবন যাপনের পদ্ধতি এবং স্রষ্টার (আল্লাহর) আদেশ ও নিষেধগুলি দিতে ত্রুটি করিওনা।।

এখানে লাঠি উঠিয়ে রাখবেনা- কথাটির অর্থ, পরিবার পরিজনদের শিক্ষা দীক্ষার ব্যাপারে কখনও অলসতা করবেনা। তারা যেন ইহা ভাবতে না পারে যে, অভিভাবক আমাদের এত কিছু খবর রাখে না।

 বরং তাদের ব্যাপারে খুব তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখতে হবে। কোথাও ইসলাম বিরোধী কোন কাজ যেন তাদের দ্বারা সংঘটিত না হয়।

 তাদের খাওয়া দাওয়া, উঠা-বসা, চলা-ফেরা, আদান-প্রদান, লেবাছ-পোশাক সব কিছু যেন শরীয়ত সম্মত হয়।

তাদের অন্তকরণ যেন আল্লাহর ভয়, বেহেশত ও দোযখের লালসা ও ভীতিতে গড়ে উঠে।

মোট কথা তাদের জীবন দুনিয়ামুখী যেন  না হয়। “দুনিয়া অস্থায়ী এবং আখেরাত চিরস্থায়ী” এই কথাটি তাহদেরকে ভাল ভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে। সুন্দর কথা বলতে হবে,আল্লাহ ওয়ালাদের সাথে সম্পর্ক করাতে হবে, ভয় ভীতি দেখাতে হবে, প্রয়ো্জন হলে বেত্রাঘাত করতে হবে।

তবে বেত (লাঠি) সদা প্রস্তুত রাখতে হবে, এর অর্থ এই না যে, স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটিতে পড়ানো যাবেনা বা অন্য কোন বিদ্যা শিক্ষা করা চলবেনা। দুনিয়াতে চলতে গেলে অনেক কিছুর প্রয়োজন আছে। সবই শিখতে হবে এবং করতে হবে, তবে আল্লাহকে স্মরণ রাখতে হবে। তিনি স্রষ্টা তাঁর অগণিত নিয়ামত আমাদের মধ্যে বিদ্যমান, তাঁর নিয়ামত ব্যতীত মুহুর্তও আমরা বাঁচতে পারব না।

তিনি একদিক দিয়ে যেমন দয়ার সাগর, অপর দিক দিয়া ঠিক তেমনি কঠিন প্রতিশোধ গ্রহণ কারীও। কাজেই যেখানেই থাকি আর যা কিছু করি সব সময় আল্লাহ পাকের আদেশ ও নিষেধগুলি মেনে চলতে হবে।

তারা যখন এইভাবে আল্লাহকে চিনবে এবং তাঁর আদেশ ও নিষেধ মেনে চলবে, তখন তাদের দ্বারা পিতা মাতার নাফরমানীর চিন্তাও করা যাবে না। এর বিপরীত তারা যখন আল্লাহ ও রাসূল (সাঃ) কে চিনবে না, তখন আল্লাহর হকই আদায় করবে না, পিতা- মাতার হক আর কি?

আজকাল যা দেখা যাচ্ছে তাই হবে। অর্থাৎ পিতা-মাতাকে ঘরের বুড়া চাকর-চাকরানীর মত মনে করবে।

তারা মা বাবারই ইজ্জত সম্মান করে না। মা বাবার আত্মীয় স্বজন-বন্ধুবান্ধবদের ইজ্জত সম্মান করবে কি? এন্তেকাল করলে ছেলে জানাযায় নামাজ পড়াবে, এটাতো বহু দূরের কথা। লজ্জায় পড়ে জানাযায় নামাযে কোন রকমে শরিক হলেও তাতে পড়িবে যে কি, তাতে কিছুইজানে না, এই জন্য তারা নিজেরাও দায়ী। কেননা প্রাপ্ত বয়স হওয়ার পর দ্বীন ইসলাম শিক্ষা ও আল্লাহকে চিনার জন্য অবশ্য মা-বাবা দায়ী থাকে না। কিন্তু ইহার পূর্বে পিতা-মাতা শিক্ষা দেয় নাই, এই জন্য তাঁরাও দায়ী থাকবে। ফলে ইহার প্রতিফল নিজের হাতে ভোগ করবেই উপরন্তু আল্লাহর নিকটও কৈফিয়ত দিতে হবে।

মৃত্যুর পর পিতামাতা এই ধরনের সন্তানদের নিকট হতে দোআ এস্তেগফার ও সদকা খয়রাত ও সওয়াব রেছানীর আশা করতে পারেন কি?

এই অবস্থা হতে পিতা-মাতার উপদেশ গ্রহণ করা উচিত নয় কি? (হে জ্ঞানীজনেরা! শিক্ষা গ্রহণ কর)

“সন্তানদের সুশিক্ষার নির্দেশ বা সন্তানদের অধিকার” এই আলোচনায় আপনাদের মতামত কামনা করছি।

সম্ম্যামনিত ভিজিটর আপনাদের সুচিন্তিত মতামত একান্তভাবে কামনা করছি।আমার ফেসবুক পেজ দেখতে ক্লিক করুন।সন্তানদের সুশিক্ষা ও প্রতিপালন।“সন্তানদের সুশিক্ষার নির্দেশ বা সন্তানদের অধিকার” এই আলোচনা শুভ বিদায়।